হোম » ব্লগ » বর্তমান বা অতীত, কখন ছিলেন বেশি সুখী ?

বর্তমান বা অতীত, কখন ছিলেন বেশি সুখী ?

বর্তমান বা অতীত, কখন ছিলেন বেশি সুখী ?

দুনিয়া ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে অথবা “আগের দিন বাঘে খাইছে” এমন কথা আমাদের সবার ই শোনা কিংবা নিজেরাই বলি। প্রচলিত একটি ধারনা হলো অতীত বর্তমানের চেয়ে ভালো ছিলো। যদি জানার উপায় থাকতো কিংবা আমরা বুঝতে পারতাম , এই বর্তমান ই আমার এক সময়ের সুখী সুন্দর পুরনোদিনগুলোতে পরিণত হবে , তাহলে কি কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসতো আমাদের সুখ চিন্তায় ? । কেন আমরা অতীতের ইতিবাচক স্মৃতি গুলোকেই বেশি স্মরন করি নেতিবাচক গুলোর তুলনায় ?

সম্ভাব্য একটি উত্তর হতে পারে যে আমরা আমাদের অতীত স্মৃতি বর্তমানের চেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করি, কিন্ত ২০০৯ সালের অগাস্টে প্রকাশিত হওয়া ” Journal of Experimental Psychology: General” নামক গবেষনাপত্রে ভ্যান বোভেন, ক্যাথেরিন হোয়াইট এবং মিশেলা হুবার দেখান আদতে বিষয়টি ঠিক উলটো। তারা পরীক্ষার জন্যে কিছু মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে ফলাফল মুল্যায়ন করলো, যার মাঝে একটি পরীক্ষাতে তারা সবাইকে একটি ভৌতিক ভিডিও দেখতে দেয়, এবং ২০ মিনিট পরে দ্বিতীয় আরেকটি ভৌতিক ভিডিও দেখায়। প্রথম ভিডিওটি দেখার পর সবার কাছে অনেক ভয়ের মনে হয়, দ্বিতীয় ভিডিওটিও তাদের কাছে ভয়ংকর মনে হয়েছিলো। কিন্ত দ্বিতীয় ভিডিওর পরে যখন আবার তাদের প্রথম ভিডিওটি দেখতে দেয়া হলো তাদের কাছে মনে হয়েছে আসলে ভিডিওটি এত ভয়ংকর ছিলোনা যতটা প্রথম বার তারা অনুভব করেছিলো। এই পরীক্ষাটিতে বোঝা যায় যে অনুভূতির তীব্রতা সময়ের সাথে কমতে থাকে। সুতরাং নিজের অতীত সম্পর্কে আমাদের জোরাল ধারনা থাকে যদিও আমরা খুব তীব্র ভাবে তা অনুভব করিনা। তবে কেন এমনটা হয় ?

আরেকটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে টরি হিগিংস এবং চার্লস স্ট্যাংগর এর প্রকাশ করা আরেকটি গবেষনাপত্রে, যেখানে তারা দেখিয়েছে আমরা বিভিন্ন বিষয়ের উপরে নিজস্ব মতামতের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেই এবং যখন অতীতের কথা ভাবি তখন অন্য কিছুর সাথে তুলনা করে বা প্রেক্ষিতে ভাবি। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যখন কেউ বলে একটি অনুষ্ঠান খুবই সুন্দর ছিলো , তখন আসলে সে বোঝায় অনুষ্ঠানটি খুবই সুন্দর ছিলো তার বর্তমান সময় পর্যন্ত উপভোগ করা সব অনুষ্ঠানের তুলনায়। আমরা যখন অতীতের কোন সুন্দর ঘটনা স্মরণ করি, আমরা মূলত সেই ঘটনার ফলাফল স্মরন করি, তার কারণ কিংবা জড়িত অনেক কিছুই স্মরন করিনা। একই ঘটনাটি যদি তারা আরো সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে উপভোগ করতো তাহলে হয়তো সুন্দর ঘটনাটি আর ততোটা সুন্দর মনে হতো না।

স্মৃতি নিয়ে করা গবেষনাসমূহের ফল বিশ্লেষন করলে দেখা যায় , আমরা যখন অতীত স্মৃতি থেকে কোন তথ্য ভেবে নেয়ার চেষ্টা করি তখন একই সাথে আমরা ভালো কিংবা আনন্দদায়ক ও মানসিক প্রশান্তি দায়ক স্মৃতিগুলোকে স্মরন করি ,পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দী দুঃখ-কষ্ট কিংবা যে কোন বাজে স্মৃতি গুলোকে এড়িয়ে যাই। এ ক্ষেত্রে বলা যায় , একজন যত বেশি দক্ষ হবে কোন নির্দিষ্ট স্মৃতি দমন করার ক্ষেত্রে , তত বেশি তার মস্তিস্ক পক্ষপাতদুষ্ট আচরন করবে ভালো স্মৃতি স্মরন করার এবং খারাপগুলোকে ভুলে থাকার জন্যে।

কেন আমরা সাধারণত ভালো স্মৃতি গুলোতে জোর দেই এবং নেতিবাচক গুলো এড়িয়ে যাই ? এই প্রশ্নটির উত্তর খুজে বের করার চেষ্টায় ২০১২ সালের নভেম্বরে ” Issue of psychological science” নামে যৌথভাবে একটি গবেষনাপত্র প্রকাশ করে বেঞ্জামিন স্টোর্ম ও তারা জোবে। মস্তিষ্কের নেতিবাচক স্মৃতি দমন করার যে প্রবণতা , তার কার্যকারিতা খুজে বের করতে তারা Retrieval Induced Forgetting প্রক্রিয়া টি অনুসরণ করে একটি পরীক্ষা চালায়, এতে ধারাবাহিক ভাবে যেসব তথ্য প্রতিফলিত হয়ে এসেছে তার মধ্যে একটি হলো, অতীতের যে কোন দমন করা স্মৃতি পরবর্তিতে স্মরন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় সেসব স্মৃতির তুলনায় যা দমন করার চেষ্টা করা হয়নি। অর্থাৎ ধরুন আপনি অতীতের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে ভাবছেন , কত সুন্দর সময় ছিলো, একসাথে খেলাধূলার স্মৃতি সমবয়সীদের সাথে, কেমন করে আপনার ভালো লাগা কাজ করেছিলো একটি নির্দিষ্ট ঘটনায়। এক্ষেত্রে আপনি শুধু ভালো অনুভুতি গুলোকেই স্মরণ করছেন , এবং পাশাপাশি খারাপ লাগা কিংবা বাজে অনুভূতি গুলোকে পরিহার করছেন। হয়তো আপনাকে প্রচলিত অর্থে ‘দুধ-ভাত’ হিসেবে খেলায় নেয়া হতো কিংবা আপনার নাম বিকৃত করে ডাকতো আপনার সমবয়সীরা, এক কথায় যে কোন খারাপ স্মৃতি যা সমসাময়িক, সেগুলোকে আপনি পরিহার করে শুধু ভালো গুলোকে বেছে নিচ্ছেন, আর এই নেতিবাচক স্মৃতি দমন এর কার্যকারিতা এমনই যে আমরা পরবর্তীতে আর স্মরন করতে পারিনা আমাদের খারাপ লাগাগুলোকে। আর ভালো স্মৃতি গুলোকে ধরে রেখে বাজে গুলো পরিহার করার এই প্রবণতা মানুষ ভেদে ভিন্ন। যার এই প্রবণতা যত বেশি ,সে অতীত সম্পর্কে তত বেশি ভালো ধারণা পোষন করে।

আমাদের মস্তিস্কে আমরা নিজেদের একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করি অতীতের, আমাদের ইতিবাচক স্ব-ধারনা বজিয়ে রাখতেই আমরা নিজের অজান্তে অতীত সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি করি। বর্তমানের চেয়ে অতীতকে অধিক ভালো মনে করার পেছনে মস্তিস্কের এই দমন নীতি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। কিন্ত সত্যিকার অর্থে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের অতীত , বর্তমানে চেয়ে অধিক সুখকর কিংবা উপভোগ্য ছিলো না, এটা আসলে শুধুই আমাদের প্রবণতা অতীতকে ইতিবাচক ভাবে মনে রাখার এবং এর পেছনে আরও অনেকগুলো কারন দায়ী।

আপনি যত নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন,আপনার জন্যে মুগ্ধ কিংবা অভিভূত হওয়া ততই কঠিন হচ্ছে। যখন আপনি তরুণ তখন বর্তমানের চেয়ে আরও বেশি পরিমানে নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন, আর এই অভিজ্ঞতা আপনার পরবর্তী অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। এ থেকে তৈরি হচ্ছে প্রত্যাশা যা প্রথমবার আপনার ছিলো না , এভাবে আমরা তুলনাপ্রবন হয়ে পড়ি। অতীতের বেশিরভাগ ঘটনাকেই আমরা আনন্দের এবং সুখকর হিসেবে স্মরণ করি, আমরা ভুলে যাই কিভাবে আমরা সেই অভিজ্ঞতার শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় করেছিলাম। সময়ের সাথে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা সহজে আর অভিভূত হতে পারিনা, তাই আমরা ধরে নেই অতীত ই হয়তো ছিলো শ্রেষ্ঠ সময় ।

হোম » ব্লগ » বর্তমান বা অতীত, কখন ছিলেন বেশি সুখী ?

1 thought on “বর্তমান বা অতীত, কখন ছিলেন বেশি সুখী ?”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।